অনুমতি ছাড়া কক্সবাজার সৈকতের কাছে তৈরি হচ্ছে ১৪ তলা হোটেল

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশ: ১২ নভেম্বর, ২০২৫, ৬:১৪
অনুমতি ছাড়া কক্সবাজার সৈকতের কাছে তৈরি হচ্ছে ১৪ তলা হোটেল

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে শহরের কলাতলী পয়েন্ট দিয়ে নামতেই দেখা যাবে বাঁ পাশে সাগরতীরে বহুতল ভবন নির্মাণ চলছে। সরকার ঘোষিত নো ডেভেলপমেন্ট জোনে বিশাল এলাকাজুড়ে টিনের ঘেরা দিয়ে ১৪ তলা হোটেল করা হচ্ছে। ঘেরা দেওয়া জায়গার এক পাশে একটি ভবনের প্রথম তলার ছাদ ঢালাইয়ের প্রস্তুতি চলছে। অন্য পাশে আরেকটি ভবনের জন্য পাইলিং হচ্ছে।

প্রশাসনের নাকের ডগায় অবৈধভাবে নির্মাণকাজ কীভাবে চলছে– এ প্রশ্ন করছেন পর্যটকসহ স্থানীয় লোকজন। পরিবেশবাদীরা বলছেন, আইন অমান্য করে স্থাপনা গড়া হচ্ছে। সরকার দ্রুত কাজ বন্ধের ব্যবস্থা না নিলে তারা আদালতে যাবেন।
নির্মাণকাজে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এখানে অত্যাধুনিক হোটেল নির্মাণ করা হচ্ছে। ছুটি নামের একটি আবাসন প্রতিষ্ঠান এটি করছে। ছুটির ফেসবুক পেজে দেখা গেছে, ‘ছুটি বে’ নামে সাত তারকা মানের হোটেল নির্মাণ হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে এ হোটেলের প্রচারণাও চালাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। বলা হয়েছে, এখানে হচ্ছে দেশের প্রথম সাত তারকা মানের হোটেল। মাত্র দুই লাখ টাকায় এ হোটেলের মালিকানায় অংশীদার করা হবে। এ ছাড়া নানা সুযোগ-সুবিধার কথা জানিয়ে হোটেলের অংশীদারিত্ব বিক্রির চমকপ্রদ প্রচার চলছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ে খোঁজ নিলে কর্মকর্তারা বলেন, কলাতলী এলাকায়  ‘ছুটি বে’ নামে কোনো হোটেল নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়নি। সামাজিক মাধ্যমে এভাবে প্রচার করা প্রতারণার শামিল।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন সমকালকে বলেন, হোটেল নির্মাণের জন্য কোনো ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি। যে জায়গায় হোটেল নির্মাণ করা হচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে, সেখানে স্যান্ডক্র্যাব নামের একটি রিসোর্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া নির্মাণকাজ করায় স্যান্ডক্র্যাবকে সম্প্রতি চার লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

সরকার ঘোষিত নো ডেভেলপমেন্ট জোনে অনুমতি ছাড়া অবৈধভাবে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগে পরিবেশ অধিদপ্তর, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ করেছে একটি পরিবেশবাদী সংগঠন। ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস) নামের সংগঠনের পক্ষ থেকে গত ২ নভেম্বর অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ২০১৩ সালের ৬ মে গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ‘ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান ফর কক্সবাজার টাউন অ্যান্ড সি-বিচ আপ টু টেকনাফ’ নামে একটি মহা পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। এই মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী কক্সবাজার পৌরসভা এলাকায় জোয়ার-ভাটার মধ্যবর্তী লাইন থেকে সৈকতসংলগ্ন প্রথম ৩০০ মিটার ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এখানে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। কিন্তু ১০০ মিটারের মধ্যে অবৈধভাবে হোটেল নির্মাণ করা হচ্ছে। তারা বিজ্ঞাপনও প্রচার করছে সামাজিক মাধ্যমে।

অভিযোগের বিষয়ে সংগঠনটির চেয়ারম্যান  অ্যাডভোকেট মজিবুল হক সমকালকে বলেন, আইন অমান্য করে এভাবে নিষিদ্ধ এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই। সরকার দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আদালতে যাবেন তারা।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন সমকালকে বলেন, একটি পরিবেশ সংগঠনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। খোঁজ-খবর নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ছুটি কক্সবাজার লিমিটেডের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ তারিক মাহমুদ বলেন, ব্যাংক থেকে অনেক টাকা ঋণ নিয়েছি। এখন প্রচার না চালালে টাকা তুলব কীভাবে?  তিনি বলেন, অনুমোদনের বিষয়টি জমির মালিক শাহজাহান মুনির জানেন।
এ প্রসঙ্গে শাহজাহান মুনির সমকালকে বলেন, ‘স্যান্ডক্র্যাব নামের রিসোর্ট নির্মাণের জন্য ২০১৫ সালে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েছি।’

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক কার্যালয় সূত্র জানায়, ২০১৫ সালের ২৩ নভেম্বর কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন ২০ শর্তে স্যান্ডক্র্যাব নামের একটি রিসোর্ট নির্মাণের অনুমতি দেন। কক্সবাজার সদর উপজেলার চৌফলদণ্ডী এলাকার চার ভাই শাহজাহান মুনির, হাবিবুর রহমান, মুজিবুর রহমান ও মিজানুর রহমানের নামে সাড়ে ৬৫ শতক জমির ওপর ১৪ তলা রিসোর্ট নির্মাণ করতে অনুমতি দেওয়া হয়। অনুমতিপত্রে ৫ নম্বর শর্তে বলা হয়েছে, অনুমতি দেওয়ার দুই বছর পর্যন্ত নকশা অনুমোদন বহাল থাকবে। এ সময়ের মধ্যে নির্মাণ না করলে ফের যথোপযুক্ত ফি দিয়ে নকশা অনুমোদন করতে হবে। এ প্রসঙ্গে ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মজিবুল হক সমকালকে বলেন, জেলা প্রশাসকের ওই অনুমোদন ছিল অবৈধ। এ ছাড়া অবৈধ ওই অনুমোদন অনুযায়ী নকশার মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। তাই এখানে স্থাপনা গড়ার কোনো সুযোগ নেই।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. নিজাম উদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, নো ডেভেলপমেন্ট জোনে হোটেল নির্মাণ এবং মিথ্যা প্রচারণার বিষয়ে একটি অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

সুত্র: সমকাল