খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙা কি স্বাস্থ্যের জন্য ভাল?
রমজান মাসে সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে ইফতারের টেবিলে যে ফলটি প্রায় অবধারিতভাবে জায়গা করে নেয়, সেটি খেজুর। বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমান দিনভর রোজা রাখার পর প্রথমেই মুখে তোলেন এই ফল। ইসলামি ঐতিহ্যেও রোজা ভাঙার ক্ষেত্রে খেজুরের কথা উল্লেখ রয়েছে। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতেও খেজুরের উল্লেখ পাওয়া যায়।
তবে ধর্মীয় অনুশীলনের বাইরে প্রশ্ন উঠতেই পারে, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর খেজুর কেন এত উপকারী?
তাৎক্ষণিক শক্তির জোগান
যুক্তরাজ্যভিত্তিক পুষ্টিবিদ শাহনাজ বশিরের ভাষায়, ‘দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর শরীর দ্রুত গ্লুকোজের চাহিদা অনুভব করে। কারণ গ্লুকোজই শরীরের প্রধান জ্বালানি। খেজুরে প্রাকৃতিক চিনি ও জটিল শর্করা থাকায় এটি দ্রুত রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে।’
এর ফলে শরীর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই শক্তি পায়। যারা ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কিছু খাননি, তাদের জন্য এটি সহজপাচ্য ও কার্যকর একটি খাবার। খেজুরে থাকা শর্করা তাৎক্ষণিক শক্তি দেয়, আবার জটিল কার্বোহাইড্রেট ধীরে ধীরে শক্তি সরবরাহ করে। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও কমে।
ভিটামিন ও খনিজে সমৃদ্ধ
খেজুরে রয়েছে ভিটামিন এ, কে ও বি–৬, সঙ্গে আয়রন ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান। দীর্ঘ সময় উপবাসের পর শরীরের যে পুষ্টিঘাটতি তৈরি হয়, তা পূরণে এই উপাদানগুলো সহায়ক ভূমিকা রাখে। অল্প পরিমাণ খাবার খেয়েই প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে খেজুর।
পানিশূন্যতা রোধে সহায়ক
খেজুর শুকনো ফল হলেও এতে প্রাকৃতিকভাবে পটাসিয়ামসহ নানা ইলেক্ট্রোলাইট থাকে। পটাসিয়াম শরীরে পানির ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইফতারে খেজুরের সঙ্গে পানি পান করলে শরীর দ্রুত হাইড্রেশন ফিরে পায়।
শাহনাজ বশির বলেন, ‘অনেকেই খেজুর ও পানি দিয়ে ইফতার শুরু করেন। এটি একদিকে শক্তি জোগায়, অন্যদিকে শরীরের পানির ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে। তার মতে, এভাবে ইফতার করলে অতিরিক্ত ইলেক্ট্রোলাইট গ্রহণের প্রয়োজন সাধারণত পড়ে না।’
অতিরিক্ত খাওয়া নিয়ন্ত্রণে
রমজানে অনেকের ওজন কমে, আবার অনেকে ইফতারে অতিরিক্ত খাওয়ার কারণে ওজন বাড়িয়েও ফেলেন। ঐতিহ্যগতভাবে অনেক মুসলমান ইফতারের শুরুতে তিন, পাঁচ বা সাতটি খেজুর খান, এরপর নামাজ আদায় করেন। এই সময়টুকুতে শরীর হজম প্রক্রিয়া শুরু করে।
খেজুরে থাকা ফাইবার হজম ধীর করে এবং তৃপ্তির অনুভূতি তৈরি করে। ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কিছুটা কমে। পুষ্টিবিদদের মতে, ইফতারের শুরুতে খেজুর খাওয়া শরীরকে সংকেত দেয় যে খাদ্য গ্রহণ শুরু হয়েছে, এতে খাবারের ভারসাম্য রক্ষা সহজ হয়।
হজমে সহায়ক
রোজাদারদের মধ্যে কোষ্ঠকাঠিন্য ও পেট ফাঁপার সমস্যা অস্বাভাবিক নয়। কারণ সাধারণ দিনের তুলনায় রমজানে খাবারের সময় ও ধরন বদলে যায়। খেজুর ফাইবারের ভালো উৎস। এটি অন্ত্রের গতি স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে এবং বর্জ্য বের করে দিতে সাহায্য করে।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রতিদিন একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য ৩০ গ্রাম ফাইবার গ্রহণের পরামর্শ দেয়। খাদ্যতালিকায় খেজুর যুক্ত করলে এই চাহিদার একটি অংশ সহজেই পূরণ হতে পারে।
খেজুর পছন্দ না হলে?
সবাই খেজুর খেতে পছন্দ করেন না। তবে পুষ্টিবিদদের মতে, শত শত ধরনের খেজুর রয়েছে কিছু নরম, কিছু শক্ত; কারও ত্বক পুরু, কারও পাতলা। পছন্দের ধরন খুঁজে নেওয়া যেতে পারে।
তারপরও যদি খেজুর খেতে ভালো না লাগে, তবে বিকল্প উপায়ে খাওয়া যেতে পারে। যেমন খেজুর, দুধ, দই ও কিছু শুকনো ফল দিয়ে স্মুদি তৈরি করা যায়। এতে স্বাদও বাড়ে, পুষ্টিগুণও বজায় থাকে।
রমজানের রোজা কেবল ধর্মীয় আচার নয়। এটি আত্মসংযমের পাশাপাশি স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় উপবাসের পর সঠিক খাবার নির্বাচন শরীরকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে। সেই বিবেচনায় খেজুর শুধু ঐতিহ্যের অংশ নয়, পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও ইফতারের জন্য একটি কার্যকর ও উপকারী খাবার।


আপনার মতামত লিখুন