তিন কিশোরী সার্ফারকে ধর্ষণ: ধামাচাপা দিতে মরিয়া হোটেল সায়মন
সাগর, তরঙ্গ আর সৌন্দর্যের শহর কক্সবাজার। হাজারো পর্যটকের পদচারণায় মুখর এই সৈকতের বুকেই গড়ে উঠেছে তারকা মানের সায়মন বিচ রিসোর্ট। এই সায়মনের তত্ত্বাবধানে চালু হয় ‘ন ডরাই সার্ফিং ক্লাব।’ বলা হয়েছিল, এটি হবে সার্ফিং খেলার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র; কক্সবাজারের তরুণ-তরুণীদের আন্তর্জাতিক মানের সার্ফার হিসাবে গড়ে তোলার স্বপ্নযাত্রা। কিন্তু পর্দার আড়ালে সেখানে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ এক অন্ধকার জগৎ। দীর্ঘদিন ধরে তিন কিশোরী সার্ফারকে একাধিকবার ধর্ষণ করেন এক প্রশিক্ষক। কিন্তু সেই প্রশিক্ষককে শাস্তির মুখোমুখি করার বদলে ঘটনা ধামাচাপা দিতে মরিয়া হোটেল সায়মন কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারে দরিদ্র পরিবারের কিশোরীদের সার্ফিং শেখানোর নামে টেনে আনা হচ্ছে এই ক্লাবে। এরপর ফাঁদে ফেলে চালানো হচ্ছে যৌন নির্যাতন। সম্প্রতি তিন কিশোরী সার্ফার সাহস করে মুখ খুলেছে। তাদের অভিযোগ, ক্লাবের প্রশিক্ষক মোহাম্মদ হাসান ওরফে সাগর (সদস্য নম্বর ৯০১৩) দীর্ঘদিন ধরে তাদের একাধিকবার ধর্ষণ করেছেন। ঘটনা ঘটেছে ক্লাব, হোটেল, এমনকি প্রশিক্ষকের ব্যক্তিগত বাসায়ও। ভয় দেখানো হয়েছে-‘কাউকে জানালে ক্লাব থেকে বের করে দেওয়া হবে, এমনকি প্রাণে মেরে ফেলা হবে।’
ভুক্তভোগীরা বলেন, একপর্যায়ে তারা বিষয়টি সায়মন কর্তৃপক্ষকে জানান। কিন্তু ন্যায়বিচারের বদলে তাদের চুপ থাকতে বলা হয়। ধর্ষণের শিকার তিনজনকে একবার হোটেলে ডেকে ভিডিও জবানবন্দি নেওয়া হলেও আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে কর্তৃপক্ষ শুধু তাদের ‘চুপ থাকতে’ কঠোর নির্দেশ দেয়।
ইমেইলে ধর্ষণের ঘটনা সায়মন কর্তৃপক্ষের স্বীকার : সায়মন রিসোর্টের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক মোরসালীন চৌধুরী বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনকে পাঠানো এক ইমেইলে তিন কিশোরীর ধর্ষণের ঘটনাটি স্বীকার করেছেন। ইমেইলে তিনি জানান, অভিযুক্ত প্রশিক্ষক মোহাম্মদ হাসান ওরফে সাগরের সদস্যপদ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে (২৩ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর)।
জানতে চাইলে যুগান্তরের কাছে অকপটে স্বীকার করেন মোরসালীন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এখন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে সেটা আমি জানি না।’
এমন ভয়াবহ অপরাধ স্বীকার করেও সায়মন কর্তৃপক্ষ ভুক্তভোগীদের পাশে না দাঁড়িয়ে বরং অভিযুক্তকে রক্ষার পথ খুঁজছে।
টাকার বিনিময়ে সংবাদ বন্ধের প্রস্তাব : ধর্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে সায়মন হোটেলের কর্মকর্তা আসাদ নুর যুগান্তরকে বলেন, ‘অভিযুক্তকে আমরা ক্লাব থেকে বের করে দিয়েছি, আর কী করতে পারি?’ তিনি আরও বলেন, ‘আপনি যদি সংবাদ প্রকাশ করেন, তাহলে তিন ভিকটিম কিশোরীকে সবাই চিনে ফেলবে। তাদের জীবন নষ্ট হয়ে যাবে।’
সংবাদ প্রকাশ না করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সায়মন এই ক্লাবের সঙ্গে জড়িত নয়। দয়া করে সায়মনকে নিউজে টানবেন না।’ এমনকি একপর্যায়ে টাকার বিনিময়ে সংবাদ বন্ধের প্রস্তাব দেন আসাদ নুর।
দরিদ্র কিশোরীদের টার্গেট : নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্লাবটির এক সাবেক সদস্য জানান, সায়মনের ‘ন ডরাই সার্ফিং ক্লাবে’ মূলত দরিদ্র কিশোরীদের টার্গেট করে আনা হয়। সার্ফিং শেখানোর নামে তাদের যৌনকর্মী হিসাবে ব্যবহার করা হয়। মাঝে মাঝে বিদেশি অতিথিরা এলে কিশোরীদের তাদের সঙ্গে পাঠানো হতো। অভিযোগ রয়েছে, এটি ক্লাব প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই হয়ে আসছে। এ বিষয়ে জেলা পুলিশ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে অবগত করা হয়েছে। তারা ভিকটিম পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে করে আইনগত সহায়তা করার বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন।
বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশন ২০১৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয়। ওইদিন কক্সবাজার প্রেস ক্লাবে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে অ্যাসোসিয়েশনের যাত্রা ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর কক্সবাজারে জাতীয় প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ২০১৬ সালের ২৫ জুলাই জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ স্বীকৃতি দেয়। বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় খেলা সার্ফিং এখন অলিম্পিকেরও একটি ইভেন্ট। বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশন খেলাটির প্রসারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন