রাষ্ট্রচিন্তার আলোকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশ: ১১ মার্চ, ২০২৬, ৯:০৫
রাষ্ট্রচিন্তার আলোকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান

বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা, রাজনীতি ও প্রশাসনিক বিকাশ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে কয়েকজন প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর নাম বিশেষভাবে উচ্চারিত হয়। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও জাতীয় অধ্যাপক তালুকদার মনিরুজ্জামান। তিনি শুধু একজন শিক্ষক বা গবেষকই ছিলেন না; বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, রাজনৈতিক রূপান্তর এবং রাষ্ট্র–সমাজ সম্পর্ক নিয়ে গভীর গবেষণা করে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক চিন্তার পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

তালুকদার মনিরুজ্জামান ১৯৩৮ সালের ১ জুলাই সিরাজগঞ্জ জেলার তারাকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। দেশে ফিরে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে সম্মাননা প্রদান করে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রচিন্তার বিশ্লেষণে তার গবেষণা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি বাংলাদেশে রাষ্ট্রের কাঠামো, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, দলীয় রাজনীতি এবং রাষ্ট্র-সমাজ সম্পর্ক নিয়ে গভীরভাবে লিখেছেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে Bangladesh Revolution and Its Aftermath, Group Interests and Political Changes: Studies of Pakistan and Bangladesh, এবং বাংলাদেশের রাজনীতি সংকট ও বিশ্লেষণ।

এই বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর সাথে আমার একান্ত আলাপচারিতায় তিনি বাংলাদেশের এক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রনায়ক—শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান—সম্পর্কে কিছু স্মৃতি ও মূল্যায়ন শেয়ার করেছিলেন। তার সেই বক্তব্যে ফুটে ওঠে একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রতি একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণের সমন্বয় ও রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে এক রাষ্ট্রনায়কের অনুসন্ধান।

তালুকদার মনিরুজ্জামান একাধিকবার উল্লেখ করেছিলেন যে, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী কৌতূহলী নেতা। তিনি শুধু প্রশাসনিক বা সামরিক দক্ষতার উপর নির্ভর করতেন না; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার তাত্ত্বিক ভিত্তি বোঝার জন্য বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করতেন।

তার ভাষায়, রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কাঠামো কীভাবে গড়ে ওঠে—এই প্রশ্নটি জিয়াউর রহমানের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।  মনিরুজ্জামান বলেছিলেন, রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে এমন কৌতূহলী রাজনৈতিক নেতৃত্ব তিনি খুব কমই দেখেছেন।

আমার সাথে একান্ত আলাপচারিতায় তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন যে, অনেক রাতে হঠাৎ করেই জিয়াউর রহমান তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসায় চলে আসতেন। তখন রাষ্ট্রব্যবস্থা, প্রশাসনিক সংস্কার, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় উন্নয়নের নানা তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হতো।

তার মতে, একজন সামরিক কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মৌলিক ধারণা বোঝার জন্য আন্তরিক ছিলেন। এই বিষয়টি তাকে অন্য অনেক রাজনৈতিক নেতার থেকে আলাদা করে তুলেছিল।

স্বাধীনতা যুদ্ধ ও জাতীয় নেতৃত্বে জিয়াউর রহমান

বাংলাদেশের ইতিহাসে জিয়াউর রহমান একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন বীর সেনানায়ক এবং পরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের মাধ্যমে তিনি জাতির সামনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ নানা রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের শাসন কাঠামো পুনর্গঠনের দায়িত্ব তার উপর এসে পড়ে। এই সময়ে তিনি রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করার জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

তালুকদার মনিরুজ্জামান বলতেন, জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল বাস্তববাদ। তিনি মনে করতেন, নবীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে দ্রুত অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক পুনর্গঠন করতে হবে।

বহুদলীয় রাজনীতির পুনঃপ্রবর্তন

জিয়াউর রহমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল বহুদলীয় রাজনীতির পুনঃপ্রবর্তন। স্বাধীনতার পর একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তে তিনি রাজনৈতিক দল গঠনের সুযোগ তৈরি করেন।

তার এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে নতুন এক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র পরিচালনার ধারণা ও নীতি নিয়ে জনগণের সামনে নিজেদের মত তুলে ধরার সুযোগ পায়।

তালুকদার মনিরুজ্জামানের মতে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হয়।

অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও গ্রামীণ উন্নয়ন জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য তিনি বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন।

তিনি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেন। খাল খনন, কৃষি গবেষণা ও গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্প তার সময়ে বিশেষ গুরুত্ব পায়।

তালুকদার মনিরুজ্জামান প্রায়ই বলতেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি গ্রাম। তাই রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্য গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা অপরিহার্য। জিয়াউর রহমান এই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করেছিলেন।

প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও গ্রাম সরকার

জিয়াউর রহমান প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তার সময়ে গ্রাম সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসনকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই ধারণার মূল লক্ষ্য ছিল জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা। তালুকদার মনিরুজ্জামান মনে করতেন, একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি।

পররাষ্ট্রনীতিতে বাস্তববাদ

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছিলেন। তিনি মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন এবং দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে ভূমিকা রাখেন।

বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি সক্রিয় রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা ছিল তার নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে মূল্যায়ন

তালুকদার মনিরুজ্জামানের মূল্যায়নে জিয়াউর রহমান ছিলেন এক অনন্য রাষ্ট্রনায়ক। তিনি বলতেন, একজন নেতা শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী হলেই রাষ্ট্রনায়ক হন না; বরং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো নিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা থাকতে হয়।

জিয়াউর রহমান সেই অর্থে রাষ্ট্র নিয়ে চিন্তা করতেন। তিনি শুধু তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করেননি; বরং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঠামো নিয়েও ভাবতেন।

তালুকদার মনিরুজ্জামানের মতে, জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের মূল শক্তি ছিল বাস্তবতা ও রাষ্ট্রচিন্তার সমন্বয়। তিনি রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে চেয়েছিলেন প্রশাসনিক দক্ষতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মাধ্যমে।

ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব

জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিত্বের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল তার সংযত ও চিন্তাশীল আচরণ। তিনি অল্প কথায় গভীর বক্তব্য প্রকাশ করতেন।

তালুকদার মনিরুজ্জামান বলতেন, জিয়াউর রহমান আলোচনায় মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। তিনি তর্ক করতেন, প্রশ্ন করতেন এবং প্রয়োজনে মতামত পরিবর্তন করতেও দ্বিধা করতেন না।

একজন সামরিক কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তিনি বুদ্ধিজীবী সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। এটি তাকে রাজনৈতিকভাবে আরও পরিপক্ক করে তুলেছিল।

ইতিহাসের আলোকে

বাংলাদেশের ইতিহাসে জিয়াউর রহমান একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও নীতির বিষয়ে বিভিন্ন মতামত থাকতে পারে, কিন্তু তার রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা অস্বীকার করা যায় না।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী তালুকদার মনিরুজ্জামান তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, বাংলাদেশের মতো নবীন রাষ্ট্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক কাঠামো গঠনের ক্ষেত্রে নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি বড় ভূমিকা পালন করে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে জিয়াউর রহমানের সময়কাল বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

তালুকদার মনিরুজ্জামানের স্মৃতিচারণ এবং বিশ্লেষণে আমরা যে জিয়াউর রহমানকে দেখতে পাই, তিনি কেবল একজন সামরিক কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক নেতা নন; বরং রাষ্ট্রের কাঠামো নিয়ে চিন্তা করা এক অনুসন্ধিৎসু রাষ্ট্রনায়ক। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও বাস্তব রাজনীতির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটি পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিলেন।

আমার সাথে একান্ত আলাপচারিতায় তালুকদার মনিরুজ্জামান যে স্মৃতিগুলো শেয়ার করেছিলেন, সেগুলো থেকে স্পষ্ট হয়—রাষ্ট্রচিন্তার প্রতি জিয়াউর রহমানের আগ্রহ ছিল গভীর এবং আন্তরিক।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এই ধরনের নেতৃত্ব ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ রাষ্ট্রের শক্তি শুধু ক্ষমতায় নয়, চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিতেও নিহিত থাকে।

ড. মোঃ রুহুল আমিন সরকার
অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার, সিআইডি, ঢাকা