কক্সবাজারে স্বপ্নতরীর টিকিট কেটে দুঃস্বপ্নে পর্যটকেরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ১১:৪৯
কক্সবাজারে স্বপ্নতরীর টিকিট কেটে দুঃস্বপ্নে পর্যটকেরা

কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পে আস্থার সংকট আরও প্রকট হচ্ছে। মহেশখালী-সোনাদিয়া নৌরুটে চলাচলকারী বিলাসবহুল কাঠের ট্যুরিস্ট নৌযান ‘স্বপ্নতরী’ হাউসবোটের বিরুদ্ধে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ ও পর্যটকদের হুমকি দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বগুড়া থেকে আগত একদল পর্যটকের অভিযোগ, নির্ধারিত ভ্রমণ বাতিল হলেও তাদের কাছ থেকে নেওয়া ৭৮ হাজার টাকা ফেরত না দিয়ে উল্টো ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।

‘স্বপ্নতরী’ হাউসবোটটি পর্যটকদের কাছে একটি ব্যতিক্রমী ও আরামদায়ক ভ্রমণ মাধ্যম হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। কক্সবাজার শহরের নুনিয়াছড়া ঘাট থেকে যাত্রা করে মহেশখালী, সোনাদিয়া দ্বীপ, হিমছড়ি এবং বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি ঘুরে দেখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। পাহাড়, নদী ও সমুদ্রের অপূর্ব সৌন্দর্য উপভোগের এই প্যাকেজে আগ্রহী হয়ে বগুড়া জেলার ৬৫ জন পর্যটক অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করে ৬৫টি টিকিট সংগ্রহ করেন।

কিন্তু স্বপ্নের সেই ভ্রমণ শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় চরম দুঃস্বপ্নে। সাথে যোগ হয়েছে হতাশা ও আতঙ্ক।

পর্যটকরা জানান, গত ৬ জানুয়ারি সকালে যাত্রা শুরুর কথা থাকলেও দলের কয়েকজন সদস্য হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠায় মানবিক বিবেচনায় ৫ জানুয়ারি রাতেই যাত্রা বাতিলের সিদ্ধান্ত স্বপ্নতরী কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। ৬ জানুয়ারি স্বপ্নতরী হাউসবোট কোনোভাবেই যাত্রা করেনি, নুনিয়াছড়া ঘাটেই নোঙর করে রাখা ছিল। যাত্রা না হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী টাকা ফেরত চাইলে শুরু হয় নানা জটিলতা।
পর্যটকদের অভিযোগ, শুরুতে কর্তৃপক্ষ সময়ক্ষেপণ করে, পরে নানা অজুহাত দেখিয়ে টাকা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এক পর্যায়ে তাদের হুমকি দেওয়া শুরু হয়।

ভুক্তভোগী পর্যটক জাহিদুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা নিজেদের ইচ্ছায় ভ্রমণ বাতিল করিনি। অসুস্থ মানুষ নিয়ে সমুদ্রে যাওয়া সম্ভব ছিল না। অথচ এখন টাকা ফেরত পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো হুমকির মুখে পড়েছি। এটি নিঃসন্দেহে প্রতারণা।’
আরেক পর্যটক জানান, ‘আমরা পরিবার-পরিজন নিয়ে আনন্দ করতে এসেছিলাম। এখন উল্টো মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। কক্সবাজারে এসে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হব, তা কল্পনাও করিনি।

পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের ঘটনা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নয়, এটি কক্সবাজারের সামগ্রিক পর্যটন খাতের ভাবমূর্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত পর্যটকদের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পর্যটন ব্যবসার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

একজন স্থানীয় ট্যুর অপারেটর বলেন, একটি হাউসবোট বা ট্যুর অপারেটরের অনিয়মের দায় শেষ পর্যন্ত পুরো পর্যটন খাতকেই বহন করতে হয়। প্রশাসনের যথাযথ নজরদারি না থাকলে পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হবে।
ভুক্তভোগী পর্যটকরা দ্রুত প্রশাসন, ট্যুরিজম বোর্ড ও নৌপরিবহন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের দাবি, অবিলম্বে টাকা ফেরত নিশ্চিত করা, হুমকি প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পর্যটন নৌযান পরিচালনায় কঠোর লাইসেন্স ও কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটন খাতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ, লিখিত চুক্তি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে স্পষ্ট রিফান্ড নীতিমালা বাধ্যতামূলক না হলে এ ধরনের প্রতারণা বন্ধ করা কঠিন হবে। বাংলাদেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজার হলেও বারবার প্রতারণা ও হয়রানির অভিযোগ ওঠায় এই নগরীর নিরাপত্তা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ‘স্বপ্নতরী’ ঘটনার মতো অভিযোগ ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।

এ বিষয়ে ৭ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৬টায় স্বপ্নতরির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হোসাইন আহম্মেদ বাহাদুরের বক্তব্য নেওয়ার জন্য তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ ঘটনায় সংবাদ প্রকাশ করা হলে উল্টো এ প্রতিবেদককে মামলার হুমকি দিয়েছেন।

জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, ‘এ বিষয়টির ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’