হাইকোর্টের আদেশ অমান্য: শহরে টোল আদায়ে বৈধতা দিলেন প্রশাসক রুবাইয়া আফরোজ
কক্সবাজা পৌর শহরের বাসটার্মিনালকে কেন্দ্র করে এক বছরের জন্য চারটি পৃথক ইজারা দিয়েছে কক্সবাজার পৌরসভা। এসব ইজারার আওতায় টার্মিনালের বাহিরের ৯টি স্থান থেকে নিয়মিত টোল আদায় করা হচ্ছে।
উচ্চ আদালত হাইকোর্টের আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসক রুবাইয়া আফরোজ এবারের ১৪৩২ বাংলা সনের এক বছরের জন্য টোল আদায় করার জন্য ইজারা দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকার পরিবর্তনের পর এটি কক্সবাজার পৌর শহরের চারপাশ ঘিরে টোল আদায়ের নামে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি বলে অভিযোগ করছে খোদ চালকরাই।
জানা যায়, এক পক্ষ কে সুবিধা দিতেই এই ইজারা দেয়া হয়েছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
গত ২০২২ সালের ২১ এপ্রিল হাইকোর্টের ৪৬৪০/২০২২ নম্বর রিট পিটিশনের আদেশে বলা হয়, টার্মিনাল ছাড়া দেশের কোনো সড়ক বা মহাসড়ক থেকে কোনো ধরনের টোল আদায় করা যাবে না। ওই নির্দেশনার আলোকে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে বিজ্ঞপ্তি জারি করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়।
পরে ২০২২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ৪৬,০০,০০০০,০৬৩,৩১, ০০২,১৩-১২৬৬ নম্বর স্মারকে দেশের সকল পৌর মেয়রকে হাইকোর্টের আদেশ প্রতিপালনের জন্য নির্দেশনা পাঠানো হয়।
এতে স্বাক্ষর করেন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মো. আব্দুর রহমান। তবে কক্সবাজার পৌরসভা এই আদেশের তোয়াক্কা না করে
বাংলা ১৪৩২ সনের জন্য চারটি পৃথক ইজারা প্রদান করে। যার মাধ্যমে পৌরসভার বাহিরের ৯টি স্থান থেকে যানবাহনের পার্কিং ফি বা সার্ভিস চার্জ নামে টোল আদায় চলছে।
নিম্নে ৯টি স্থান তুলে ধরা হলো: কক্সবাজার বিমানবন্দর সড়কের মুক্তিযোদ্ধা স্মরণী, সুগন্ধা পয়েন্ট, কলাতলীর বেলি হ্যাচারী, কক্সবাজার বাজারঘাটা, পৌরসভার সংলগ্ন স্টেশন, লালদিঘির পাড়স্থ প্যানোয়া রাস্তার মাথা, খুরুশকুল ব্রিজ সংলগ্ন, ঈদগাঁও মাঠ সংলগ্ন, বদর মোকামস্থ কস্তুরাঘাট নতুন ব্রিজ।
গত সরকারের আমলে কস্তুরাঘাটসহ কয়েকটি পয়েন্টে টোল আদায় করা হতো না। অথচ এবার পৌর প্রশাসক রুবাইয়া আফরোজ স্বাক্ষরিত ইজারাপত্রে স্পষ্টভাবে এসব স্থান উল্লেখ করে টোল আদায়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ আছে, পৌর এলাকায় প্রবেশ করলেই পৌর টোলের নামে চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছে যানবাহন চালকরা। যানবাহনের প্রকারভেদে আদায় করা হচ্ছে চাঁদা।
পৌরসভার প্রশাসক রুবাইয়া আফরোজ স্বাক্ষরিত ইজারাপত্র ২৮৩ নম্বর স্মারকে ইজারাদারকে ১৪৩২ বাংলা সনের জন্য ট্রাক, কাভার ভ্যান, মিনিট্রাক ও পিকআপ এর পার্কিং ফি/সার্ভিস চার্জ আদায় কার্যাদেশ প্রদান করেন। কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসক স্বাক্ষরিত ইজারাপত্র ২৮৪ নম্বর স্মারকে ইজারাদারকে ১৪৩২ বাংলা সনের জন্য জীপ, কার, মাইক্রো, নোহা, হাইয়েছ এর পার্কিং ফি/সার্ভিস চার্জ আদায় কার্যাদেশ প্রদান করেন। ২৮৫ নম্বর স্মারকে ইজারাদারকে বলা হয়-১৪৩২ বাংলা সনের জন্য কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালসহ বাস স্ট্যান্ড ও কাউন্টার, হতে পার্কিংফি/সার্ভিস চার্জ আদায়।
কক্সবাজার পৌরসভার ২৮৭ নম্বর স্মারকে ইজারাদারকে বলা হয়-১৪৩২ বাংলা সনের জন্য সিএনজি, টেম্পু, মাহিন্দ্র, নছিমন, হিউম্যান হলার এর পার্কিং ফি/সার্ভিস চার্জ আদায়ের ইজারার কার্যাদেশ প্রদান করেন।
এদিকে হাইকোর্টের আদেশ থাকা সত্বেও কক্সবাজার পৌর এলাকায় টার্মিনাল ব্যতিরে আলাদা ৪ টি ইজারা ও ৯টি স্থান উল্লেখ করে ইজারা দেয়া হয়েছে এমন প্রশ্ন করা হয় কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসক রুবাইয়া আফরোজকে। তিনি প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন টার্মিনালকে কেন্দ্র করে শুধু একটিই ইজারা হয়েছে এবং যানবাহনের জন্য ৪টি ইজারার কথা স্বীকার করেন তিনি। হাইকোর্টের কোন আদেশের বিষয়ে আগ থেকে তিনি অবগত ছিলেন না এবং কেউ জানাননি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কক্সবাজারে অবৈধ টোল আদায়, আইন ও আদালতের আদেশের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন উল্লেখ করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও কক্সবাজার জেলা দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী মোহাম্মদ রাশেদ বলেন, ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ এর ধারা ৩৮ এবং হাইকোর্টের রিট পিটিশন নং ৪৬৪০/২০২২-এ প্রদত্ত নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্ধারিত টার্মিনাল ব্যতীত দেশের কোনো সড়ক বা মোড় থেকে টোল বা পার্কিং ফি আদায় আইনবহির্ভূত।
দুঃখজনকভাবে কক্সবাজার পৌরসভা আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা অমান্য করে ৯টি স্থানে টোল আদায়ের জন্য একাধিক ইজারা প্রদান করেছে। যা শুধু বেআইনি নয়, বরং এটি আদালতের আদেশের সরাসরি লঙ্ঘন।
এই ধরনের বেআইনি কর্মকান্ড আইনের শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাই, বিষয়টি তদন্তপূর্বক দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং হাইকোর্টের নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর করা। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়-এ নীতি অনুসরণ করে কক্সবাজারে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার আহবান জানান তিনি।


আপনার মতামত লিখুন