বদলির আদেশের পরও বহাল তবিয়তে বিতর্কিত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা তানভীর আহমদ
বদলির আদেশ জারির পরও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় বহাল রয়েছেন বিতর্কিত কর্মকর্তা তানভীর আহমদ। তাঁর বিরুদ্ধে অধিগ্রহণ করা জমির প্রকৃত মালিকদের বঞ্চিত করে ভুল পেমেন্ট, হাইকোর্টে মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও প্রায় দেড় কোটি টাকার চেক বিতরণ এবং কমিশন-বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় জেলা প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। একই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট এক সার্ভেয়ারকে তাৎক্ষণিক স্ট্যান্ড রিলিজ করা হলেও অভিযোগের মুলে থাকা তানভীর আহমদ এখনো দায়িত্বে থাকায় প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়েও।
অন্যদিকে, মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে নামজারি, মিসকেসসহ ভূমিসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা নিতে অতিরিক্ত টাকা আদায়, দালালনির্ভর সেবা এবং সেবাগ্রহীতাদের দীর্ঘদিন হয়রানির অভিযোগ উঠেছিল। সে সময় একাধিক ভুক্তভোগী তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা গণমাধ্যমের কাছে তুলে ধরেন। ফলে দুই কর্মস্থলেই ভূমিসেবা নিয়ে তাঁর ভূমিকা ঘিরে বিতর্ক সামনে এসেছে।
বিভাগীয় কমিশনোরের একটি আদেশে দেখা যায়, গত ২৯ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের এক আদেশে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী কমিশনার তানভীর আহমদকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বদলি করা হয়। আদেশে কমিশনারের একান্ত সচিব ও সংস্থাপন শাখার সিনিয়র সহকারী কমিশনার হেদায়ত উল্লার স্বাক্ষর রয়েছে৷ । আদেশে বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাঁদের নামের পাশে উল্লেখ করা কর্মস্থলে সিনিয়র সহকারী কমিশনার/সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বদলির কথা বলা হয়।
তবে বদলির আদেশের পরও তানভীর আহমদ এখনো বহাল তবিয়তে।
প্রকৃত মালিকদের বঞ্চিত করে দেড় কোটি টাকার চেক?
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা মৌজায় অধিগ্রহণ করা জমির ক্ষতিপূরণের অর্থ বিতরণ। অভিযোগকারীদের দাবি, অধিগ্রহণ করা জমির প্রকৃত মালিকদের প্রাপ্য অর্থ না দিয়ে অন্যদের নামে ভুল পেমেন্ট দেওয়া হয়েছে।
এমনকি হাইকোর্টে মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও মামলা নিষ্পত্তি বা কর্তন হয়েছে—এমন তথ্যের ভিত্তিতে প্রায় দেড় কোটি টাকার চেক বিতরণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব চেকের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে অর্থও স্থানান্তরিত হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে প্রকৃত জমির মালিকেরা জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন এবং হাইকোর্টে মামলা চলমান থাকার প্রমাণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র জমা দেন।
পরে অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে এক বিজ্ঞ আইনজীবীকে সঙ্গে নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের তৎক্ষালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ইমরান হোসাইন সজিবের কাছে যান ভুক্তভোগীরা। তাঁদের দাবি, অভিযোগ ও মামলার নথি দেখার পর এডিসি রেভিনিউ তাৎক্ষণিকভাবে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা তানভীর আহমদ এবং সংশ্লিষ্ট সার্ভেয়ার সৈকত চাকমাকে পেমেন্ট বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে অর্থ ছাড় বন্ধ করতে এক ঘণ্টার মধ্যে লিখিত চিঠি দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা তৈরি হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, ঘটনার দিনই সংশ্লিষ্ট সার্ভেয়ার সৈকত চাকমাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়। তবে অভিযোগের মূল কেন্দ্র থাকা তানভীর আহমদের নাম উঠে এলেও তাঁর বিরুদ্ধে কী ধরনের বিভাগীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
সাটুরিয়ায়ও ছিল ঘুষ ও দালালনির্ভর সেবার অভিযোগ:
কক্সবাজারে দায়িত্ব পালনের আগে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে কর্মরত থাকাকালে তানভীর আহমদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছিল। সে সময় ভূমি অফিসে নামজারি, মিসকেসসহ বিভিন্ন সেবা নিতে বাড়তি টাকা দেওয়ার অভিযোগ করেন একাধিক সেবাগ্রহীতা।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি ফি দিয়ে নামজারি করতে গেলেও দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা দিতে হতো বলে অভিযোগ ছিল। জমির মালিকানা বা ওয়ারিশসংক্রান্ত জটিলতা থাকলে প্রতি শতাংশ জমির জন্য এক থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দাবি করার অভিযোগও সামনে আসে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ ছিল, দালালের মাধ্যমে তদবির না করলে নামজারির আবেদন দীর্ঘদিন আটকে থাকত কিংবা বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে বাতিল করা হতো। বিপরীতে, দালালের মাধ্যমে যোগাযোগ ও অতিরিক্ত অর্থের লেনদেন হলে অল্প সময়ের মধ্যেই কাজ সম্পন্ন হতো বলে তাঁরা দাবি করেন।
সাটুরিয়া ভূমি অফিসে শুনানির জন্য আসা কয়েকজন সেবাগ্রহীতা তখন নিজেদের ভোগান্তির কথা তুলে ধরেন। তাঁদের কেউ বছরের পর বছর মিসকেসের শুনানিতে অংশ নিয়েও প্রতিকার পাননি বলে অভিযোগ করেন। আবার কেউ আদালতের রায় ও দলিল থাকার পরও জমির নামজারি নিয়ে জটিলতায় পড়ার কথা জানান।
এক ভুক্তভোগীর অভিযোগ ছিল, ১৫ বছর আগে কেনা জমি নিজের নামে নামজারি করার পরও আরেকজনের করা মিসকেসের কারণে তিন বছর ধরে তাঁকে শুনানিতে অংশ নিতে হচ্ছে। আরেকজন জানান, আদালতে জমিসংক্রান্ত মামলায় রায় পাওয়ার পরও তাঁর কেনা জমি অন্যের নামে নামজারি করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এ ছাড়া জমির রেকর্ডে প্রকৃত মালিকের নামে কম পরিমাণ জমি থাকা সত্ত্বেও বেশি জমি নামজারি, অনলাইন আবেদন গ্রহণ না করা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগও উঠে আসে।
প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে
ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ ও বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অধিগ্রহণের কারণে জমি হারানো মানুষের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাওয়া তাঁদের আইনগত অধিকার। সেখানে প্রকৃত মালিককে বাদ দিয়ে ভুল পেমেন্টের অভিযোগ উঠলে তা শুধু আর্থিক অনিয়মের প্রশ্ন নয়; বরং প্রশাসনিক দায়িত্ব ও জবাবদিহির বিষয়ও সামনে আসে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের মুঠোফোনে একাধিবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কল রিসিভ না করায় বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি৷


আপনার মতামত লিখুন